ঢাকায় হারাচ্ছে জলাশয়, আগুন নেভানোর পানি কই
প্রবাস নিউজ ডেস্কঃ
হাতিরঝিল থেকে হেলিকপ্টার পানি নিয়ে ছুটছে রাজধানীর বঙ্গবাজারসংলগ্ন এনেক্সকো টাওয়ারসহ আশপাশের ভবনগুলোর আগুন নেভাতে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর নিজস্ব গাড়িতে নেওয়া পানির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলসংলগ্ন পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। ঢাকা ওয়াসার কর্মীরা গাড়ি ভর্তি পানি নিয়ে ছুটছেন।
গত মঙ্গলবার বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় চোখে পড়েছে এসব দৃশ্য। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
আগুন নিয়ন্ত্রণের পর গণমাধ্যমকর্মীদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন জানিয়েছিলেন, উৎসুক জনতা, পানির স্বল্পতা ও বাতাসের কারণেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হয়েছে।

হেলিকপ্টার থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়
রাজধানীতে যতবারই এমন বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে, ততবারই আলোচনায় আসে আগুন নেভানোর জন্য পানির উৎস নিয়ে। তবে তারপর সব আলোচনা থেমেও যায়।
বিভিন্ন আইন ও নীতিতে পরিবেশবান্ধব নগরীতে পুকুর, জলাধার কী পরিমাণে থাকতে হবে, করণীয় কী, তার নির্দেশনা দেওয়া আছে। তবে পুকুর ও জলাধার ভরাটের মহোৎসব চলছেই। সেগুনবাগিচা খাল, নারিন্দা খাল, ধোলাইখাল, গোপীবাগ খাল, সূত্রাপুর খালসহ বিভিন্ন খাল ভরাট হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
আইনে যা আছে
মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের জন্য ২০০০ সালে প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ আইনটি করা হয়েছে। আইনে প্রাকৃতিক জলাধার বলতে নদী, খাল, বিল, দিঘি, ঝরনা বা জলাশয় হিসেবে মাস্টার প্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার, স্থানীয় সরকার বা কোনো সংস্থার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্যাপ্রবাহ এলাকা হয়েছে ঘোষিত কোনো জায়গা এবং পানি ও বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন কোনো ভূমিকেও বোঝানো হয়েছে।
খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না বা এ ধরনের জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না এবং ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না বলেও আইনে উল্লেখ আছে। আইনটি ভঙ্গ করলে জরিমানার কথাও বলা হয়েছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে।

শুভাঢ্যা খালে ময়লার ভাগাড়ের নিচে এখন অল্প পানি দেখা যায়
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ২০১৯ সালে ঢাকা ও এর চারপাশের জলাশয় ভরাটের একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, মহানগর এলাকায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা জলাশয় থাকা উচিত। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে এ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৫ হাজার ৭৫৭ একর জলাভূমি ঢাকা থেকে হারিয়ে গেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের আওতাধীন এলাকায় এ গবেষণা করা হয়। এতে ঢাকা সিটি করপোরেশন, তারাবো, ভুলতা, পূর্বাচল, কালীগঞ্জ, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, ধামসোনা ও কেরানীগঞ্জ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জলাশয় হারাচ্ছে
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ আইনসহ বিভিন্ন আইন থাকার পরও জলাশয় কমতে কমতে কেন্দ্রীয় ঢাকায় ৫ থেকে ৬ ভাগে নেমে এসেছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান পুকুর, জলাশয় ভরাট করছে।
বক্স-কালভার্ট নির্মাণের আড়ালে খাল হারিয়ে যাচ্ছে। জলাশয় যা আছে, তা-ও দখল হয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কল্যাণপুরের ১০০ একর জলাশয় বর্তমানে ৩ একরে নেমে এসেছে।
গত বছরের মে মাসেও আইপিডি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রাজধানীর জলাশয়-জলাধার রক্ষার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা পালন না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকার আশকোনা এলাকায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জলাশয় ভরাটের প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। জলাশয়টি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দক্ষিণখান মৌজায় অবস্থিত।
স্থপতি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারিভাবেই জলাশয় ভরাটের মহোৎসব চলছে। রাজধানীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড পুকুর ভরাট করে পানি ভবন করেছে। কল্যাণপুরের বিশাল জলাধার ভরাট করে বিএডিসির প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। বঙ্গবাজারের ১০০ গজ দূরে ওসমানী উদ্যানে উন্নয়নের নামে পুকুরটি শুকনা খটখটে হয়ে পড়ে আছে। বঙ্গবাজারের আগুন নেভাতে এটিকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা গেল না। পুরান ঢাকায় ওয়াটার হাইড্রেন্ট সিস্টেম থাকলেও নতুন ঢাকায় এ ব্যবস্থা চালু করা হয়নি।’
ঢাকার ওসমানী উদ্যানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করেছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। নগরবাসী এ উদ্যানে গিয়ে রাগ কমাবেন। তাই তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’। রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবনের উল্টো দিকে ২৪ একরের ওসমানী উদ্যানে দুটি জলাশয় রয়েছে। জলাশয় দুটি সংস্কার করে সারা বছর পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করার কথা ছিল।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। তবে প্রকল্পটি এখনো শেষ হয়নি।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ১০ কারখানার ৮টি বাংলাদেশের। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) প্লাটিনাম লিড সনদ পাওয়া ফতুল্লা অ্যাপারেলস, প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেড ও মিথেলা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড—তিনটিরই নকশা করছেন আর্কভিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী স্থপতি মেহেরুন ফারজানা।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বায়ারের চাপে হলেও কারখানাগুলো কারখানা ভবন নির্মাণের সময় অগ্নি নির্বাপণের জন্য আইন অনুযায়ী ভবনে পুকুরসহ পানির যে ধরনের ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে, তা মেনে চলার চেষ্টা করছে। তবে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সময় খরচের ভয়ে অনেকেই এসব বিষয় মানতে চাচ্ছেন না। তাই আইনের বাস্তবায়ন জরুরি।’
স্মৃতিতে পুকুর-খাল ও নদীর গল্প
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগা নগর এলাকার ব্যবসায়ী প্রায় ৬০ বছর বয়সী রফিকুল ইসলামের বাড়ির কাছেই শুভাঢ্যা খাল। ঢাকার উপশহর বা ঢাকা ২ আসনে অবস্থিত এ এলাকার শুভাঢ্যা খাল প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম ফিরে গেলেন তাঁর ছোটবেলায়। তিনি বলেন, খালটিতে লঞ্চ ও নৌকা চলত। পানি এত ভালো ছিল যে তা বাড়ির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হতো। আর বর্তমান প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখন খাল হাইট্যা পার হওয়া যায়। ময়লার ভাগাড়ের নিচে অল্প বিস্তর পানি আছে।’
পোশাকশিল্প কারখানার কাটা কাপড়ের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের ছোটবেলার স্মৃতির সঙ্গে বুড়িগঙ্গাও মিশে আছে। তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় দুই-তিন ঘণ্টা গোসল করতাম বলে বাড়ি ফিরে বকা খেতাম। আর এখন পানিতে হাত দিতেও ভয় লাগে। দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যায় না।’ নিজেদের বাড়ির পেছনের পুকুরটি ভরাট হওয়াসহ আশপাশের একাধিক পুকুর ভরাটের ঘটনা চোখের সামনেই ঘটেছে বলেও জানালেন তিনি।
রাজধানীর বঙ্গবাজারের মতো বড় আগুনের ঘটনা ঘটলে আগুন নেভানোর জন্য পানির উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকায় এখন পুকুর নেই বললেই চলে। খালটির বেহাল অবস্থা। বুড়িগঙ্গা দখলদারদের দখলে চলে যাচ্ছে। তাই তাঁর মতে, আগুন নেভানোর জন্য পানি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন মনিরুদ্দিন। বাবার কাজের সূত্রে ছোটবেলা থেকেই হলের কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টারে থাকতেন এস এম মহসীন। ১৯৭৮ সালে তিনি নিজেও হলে চাকরি পান। ২০২১ সালে জ্যেষ্ঠ বার্তাবাহক হিসেবে অবসর নেন।
রোকেয়া হলের ভেতরে বিশাল পুকুরটি কোন জায়গায় ছিল জানতে চাইলে এস এম মহসীন বলেন, এখন হলের লাইব্রেরির কাছে মাঠে যে বড় কড়ইগাছটা আছে, সেখানেই ছিল বড় একটি পুকুর। মাঠজুড়েই পুকুরটা ছিল। পুকুরে নৌকাও ছিল। তারপর তা ভরাট করে ফেলা হয়। তবে ঠিক কত সালে পুকুরটি ভরাট হয়েছিল, তা আর এখন মনে করতে পারলেন না মহসীন।
পরিবেশ কর্মীরা যা বলছেন
পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা আন্দোলন করে নদী, পুকুরসহ জলাশয় সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় নদীবিষয়ক কর্মশালায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নদী রক্ষায় প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে নাগরিক সমাজকে পর্যবেক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঁকখালীসহ বিভিন্ন নদী রক্ষায় আন্দোলন প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা যদি নদী বাঁচাতে কথা না বলতাম, তাহলে অনেক আগেই বুড়িগঙ্গা আবাসিক এলাকা হয়ে যেত। বাঁকখালীও হয়তো আরও ১০ বছর আগে শেষ হয়ে যেত। তাই সোচ্চার হতে হবে।’
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহানগরী ঢাকাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ঢাকা শহরের এখন আর কোনো দর্শন নেই। সচিবালয়সহ বড় বড় স্থাপনাকে প্রয়োজনে অন্য কোথাও স্থানান্তর করতে হবে। ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য, এ নিয়ে আর তর্ক করা উচিত না। সরকারি সংস্থা জলাশয় ভরাট করে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, এটি কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ঢাকা) দিনমনি শর্মা গত ৩৪ বছরে অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বঙ্গবাজারের আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে পানির স্বল্পতার জন্য। অনেক দূর থেকে পানি আনতে হয়েছে। আশপাশে পুকুর, ডোবা, জলাশয় থাকলে কাজটা সহজ হতো। ঢাকা শহরে এখন পুকুরের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। ওয়াটার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থাও চালু করা সম্ভব হয়নি। সব মিলে আগুন লাগলে তা নেভানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
- `রক্তদানে বিত্ত বৈভব নয় প্রয়োজন সেবার মানসিকতা`
- ১২ পয়েন্ট কাটা পড়লেই বাতিল ড্রাইভিং লাইসেন্স
- প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে টোটাল ফিটনেস ডে
- তুরস্কের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শ্রমিক পাঠাতে চায় বাংলাদেশ
- ভারতে যাওয়া কমেছে বাংলাদেশিদের
- নব্বইয়ের দশকে গ্রামে আমাদের শৈশব কৈশোরের ঈদ
- বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যে অবস্থানে
- মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক
- চীনা বিনিয়োগকারীদের দেশে কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান ড. ইউনূসের
- সফলতার গল্প পড়ে পাঠকেরা অনুপ্রাণিত হন








