গরু, ভেড়া দেওয়ার প্রকল্প
সাড়ে তিন বছরের প্রকল্পে সময় বাকি তিন মাস, কাজ বাকি অর্ধেকের বেশি
প্রবাস নিউজ ডেস্কঃ
সাঁওতাল, ওঁরাও, খাসি, গারো, মাহাতো, পাহানের মতো সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৮০ ভাগ মানুষের বাস দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাঁদের ৮০ ভাগ কৃষির ওপর নির্ভরশীল, অথচ দুই–তৃতীয়াংশেরই ভূমি নেই। এই জাতিগোষ্ঠীর প্রতিটি পরিবারকে গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। সাড়ে তিন বছরের এই প্রকল্পের মাত্র তিন মাস বাকি আছে, কিন্তু কাজ বাকি অর্ধেকর বেশি।
সমতলভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন’ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি শুরু হয়, যা চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে যে পরিমাণ প্রাণিসম্পদ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, তার অর্ধেকও এখনো দিতে পারেনি অধিদপ্তর।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও ছয় ধাপের মধ্যে কেবল প্রথম ধাপের ৬ হাজার ৯১০টি পরিবারকে একটি করে বকনা গরু দেওয়ার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আর দ্বিতীয় ধাপে ২৬ হাজার ৩৩৯টি পরিবারকে দুটি করে ভেড়া দেওয়ার ধাপ শেষ পর্যায়ে
এ প্রকল্পের আওতায় সমতলের ২৯টি জেলার ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৭৬টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারকে প্রাণিসম্পদ দেওয়ার কথা রয়েছে। এতে ব্যয় করা হচ্ছে ৩৫২ কোটি টাকা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মোট ছয়টি ধাপে পরিবারগুলোকে গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগি দেওয়া হচ্ছে। তবে কোন পরিবারকে কী দেওয়া হচ্ছে, তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও সেখানকার সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বাছাই করে থাকে।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও ছয় ধাপের মধ্যে কেবল প্রথম ধাপের ৬ হাজার ৯১০টি পরিবারকে একটি করে বকনা গরু দেওয়ার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ২৬ হাজার ৩৩৯টি পরিবারকে দুটি করে ভেড়া দেওয়ার ধাপ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ৮ হাজার ৪৬০টি পরিবারকে একটি করে হৃষ্টপুষ্টকরণ গরু, ২০ হাজার ২৪৬টি পরিবারকে দুটি করে ছাগল, ৩৪ হাজার ৫৭৮টি পরিবারকে ২০টি করে মুরগি এবং ৩৪ হাজার ৫৭৮টি পরিবারকে হাঁস দেওয়ার কার্যক্রম এখনো শুরুই করতে পারেনি অধিদপ্তর।
কেন প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, তার ব্যাখ্যা দিয়ে প্রকল্প পরিচালক অসীম কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকল্পটি অনুমোদনের পরপরই করোনা শুরু হয়। সরকার করোনার কারণে অন্যান্য প্রকল্পের মতো এটির বরাদ্দেও কাটছাঁট করে। ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি অর্থবছরে যে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন ছিল, তা পাওয়া যায়নি। কিন্তু যা বরাদ্দ পেয়েছি, তা শতভাগ বাস্তবায়ন করেছি।’আমাদের আগে গরু ছিল না, এখন হয়েছে। বাছুরটি বড় হলে বিক্রি করলে আরেকটি কাজ করা যাবে
দীপ্তি সরকার, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রথম আলোকে বলেন, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। তারা সরকারি সুযোগ–সুবিধা খুব কম পায়। অবশেষে তারা যখন একটি প্রকল্প পেল, সেটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক।
এই প্রকল্পে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রেখে যেন দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করা হয়, সেই দাবি জানিয়ে সঞ্জীব দ্রং বলেন, যথাসময়ে এটা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে এই সহযোগিতা পেলে তাঁরা কিছুটা হলেও টিকে থাকার সম্বল পেত।
বেশ কিছু ভেড়ার মৃত্যু
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ইউনিয়নের বনঘেরা গ্রাম গায়রা। এই গ্রামের বাসিন্দা কণিকা মৃ এই প্রকল্পের আওতায় দুটি ভেড়া পেয়েছিলেন। তার কয়েক মাস পর ডায়রিয়া হয়ে দুটি ভেড়াই মারা যায়। কণিকা মৃ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভেড়া দুটি সুস্থ করার অনেক চেষ্টা করেছি। ওষুধ খাইয়েছি, কিন্তু ভালো হয়নি।’
গ্রামটির বাসিন্দা অনিতা নংশাং–এর ভেড়া দুটিও ডায়রিয়া হয়ে মারা যায়। অনিতার অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও দেয়নি। নিজেরাই ওষুধ কিনে খাইয়েছেন। ভেড়ার জন্য ঘর দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেয়নি। তিনি বলেন, ভেড়া দুটি থাকলে খুব ভালো হতো।
মধুপুর উপজেলায় আরও কয়েকজনের ভেড়াও মারা গেছে বলে জানা গেছে। কেবল মধুপুর নয়, নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায়ও ভেড়া মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্গাপুরের শ্যামনগর গ্রামের রিতেন্দ্র হাজং দুটি ভেড়া পেয়েছিলেন। পাওয়ার তিন মাস পরে একটি, চার মাস পর আরেকটি ভেড়া ডায়রিয়া হয়ে মারা যায়। রিতেন্দ্র প্রথম আলোকে বলেন, তাদের এলাকায় আরও কয়েকজনের ভেড়া এভাবে মারা গেছে।এই প্রকল্পের আওতায় ২৯টি জেলার সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৭৬টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারকে প্রাণিসম্পদ দেওয়ার কথা রয়েছে। এতে ব্যয় করা হচ্ছে ৩৫২ কোটি টাকা
গরুর তুলনায় ভেড়া মৃত্যুর হার একটু বেশি বলে জানান প্রকল্প পরিচালক অসীম কুমার দাস। অনেককেই আরেকটি করে ভেড়া দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাণী বিতরণের এক মাসের মধ্যে মারা গেলে ঠিকাদার তার বদলি হিসেবে আরেকটি দিতে বাধ্য। মধুপুরে মৃত ভেড়ার বিপরীতে ১০০টি নতুন ভেড়া দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া মারা যাওয়ার কথা বললেও কিছুসংখ্যক সুফলভোগীর তা বিক্রি করে দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, এ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ২০১৫ সালে তৈরি করা হয়েছিল। তখন এসব উপকরণের যে দাম ছিল, তা অনেক বেড়েছে। কোনো কোনো উপকরণের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এতে মানসম্মত প্রাণী ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে গেছে।
অবশ্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই প্রকল্পে তাদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। সেটা করা হলে তাঁরা বলতে পারতেন কোন প্রাণী লালনপালন করতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
সংসার আগের চেয়ে ভালো চলে
এই প্রকল্পের আওতায় দেওয়া গরুর মৃত্যু হয়েছে খুব কম। ফলে প্রায় সাত হাজার গরু বিতরণ করলেও মারা যাওয়ার কারণে ঠিকাদারকে ২৯টি গরু বদলি হিসেবে দিতে হয়েছে। যেখানে একটি উপজেলাতেই মৃত্যুর কারণে বদলি হিসেবে ১০০টি ভেড়া দিতে হয়েছে।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের দোলন হাজং ও দীপ্তি সরকার দম্পতি একটি গরু পায়। মুঠোফোনে কথা হয় দীপ্তি সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, এই গ্রামে চারটি পরিবার গরু পেয়েছে। তার মধ্যে তিনি তিনটি পরিবারের তথ্য জানেন। সেই তিন পরিবারের গরুই বেঁচে আছে। সেগুলো বাচ্চাও দিয়েছে।প্রকল্পটি অনুমোদনের পরপরই করোনা শুরু হয়। সরকার করোনার কারণে অন্যান্য প্রকল্পের মতো এটির বরাদ্দেও কাটছাঁট করে। ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি অর্থবছরে যে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন ছিল, তা পাওয়া যায়নি। কিন্তু যা বরাদ্দ পেয়েছি, তা শতভাগ বাস্তবায়ন করেছি
অসীম কুমার দাস, প্রকল্প পরিচালক
দীপ্তি সরকার যে গরুটি পেয়েছেন, সেটিও একটি বাচ্চা দিয়েছে। চার–পাঁচ কেজি করে দুধও দিয়েছে গরুটি। দীপ্তি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আগে গরু ছিল না, এখন হয়েছে। বাছুরটি বড় হলে বিক্রি করলে আরেকটি কাজ করা যাবে।’
এই গ্রামের বাসিন্দা নিরলা হাজং যে গরুটি পেয়েছেন, সেটি এখন পর্যন্ত দুটি বাচ্চা দিয়েছে। এক ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও এক নাতিকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁদের ফসলি জমি নেই। গরুটি এখন দিনে চার লিটার দুধ দেয় জানিয়ে নিরলা হাজং বলেন, ‘গরু পেয়ে আমাদের ভালো হয়েছে। নিজেরা দুধ খেতেও পারি, আবার বেচতেও পারি। গরু পাওয়ায় আগের চেয়ে সংসার এখন একটু ভালো চলে।’
দুটি ভেড়া পান মধুপুরের টেলকি গ্রামের গ্যাব্রিয়েল। সেই দুই ভেড়া আরও দুটি বাচ্চা দিয়েছে। গ্যাব্রিয়েল বলেন, ভেড়াগুলো পেয়ে খুব ভালো হয়েছে।
সমতলের সবাই পাবে না
এই প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৭৬টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারকে এসব প্রাণী দেওয়ার সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে করানো গণনায় ১ লাখ ৮০ হাজার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারের তথ্য পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে এই গণনার বাইরে গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, মাগুরাসহ বেশ কিছু জেলা রয়েছে। এতে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারের সংখ্যা আরও বাড়বে। ফলে এই প্রকল্পের আওতায় পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন না।
প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানাচ্ছেন, সমতলের সবাইকে এ সুবিধা দিতে হলে এ প্রকল্প শেষ হলে এর বর্ধিত অংশ হিসেবে দ্বিতীয় ধাপের জন্য নতুন করে আরেকটি প্রকল্প নিতে হবে।
আদিবাসী ফোরামের সঞ্জীব দ্রং মনে করেন, ‘বরাবরই উপেক্ষিত থাকা এই সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এর আগে কখনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এবার যখন নেওয়া হলো, তখন একজনকে সুবিধা দিয়ে আরেকজনকে যেন বঞ্চিত না করা হয়। প্রয়োজনে আরেকটি প্রকল্প নিয়ে হলেও সমতলের সবাইকে এ সুবিধার আওতায় আনা উচিত।’
- `রক্তদানে বিত্ত বৈভব নয় প্রয়োজন সেবার মানসিকতা`
- ১২ পয়েন্ট কাটা পড়লেই বাতিল ড্রাইভিং লাইসেন্স
- প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে টোটাল ফিটনেস ডে
- তুরস্কের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শ্রমিক পাঠাতে চায় বাংলাদেশ
- ভারতে যাওয়া কমেছে বাংলাদেশিদের
- নব্বইয়ের দশকে গ্রামে আমাদের শৈশব কৈশোরের ঈদ
- বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যে অবস্থানে
- মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক
- চীনা বিনিয়োগকারীদের দেশে কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান ড. ইউনূসের
- সফলতার গল্প পড়ে পাঠকেরা অনুপ্রাণিত হন








