ঢাকা, ২০২৬-০৮-০১ | ১৬ শ্রাবণ,  ১৪৩৩

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপের গোমর ফাঁস করলেন

প্রবাস নিউজ ডেস্কঃ

প্রকাশিত: ০০:০৬, ১২ অক্টোবর ২০২৩  

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষার নামে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে; তার নেপথ্যের গোপন এজেন্ডা ফাঁস করে দিয়েছেন ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল হেরাল্ডের অনলাইন সংস্করণে 'আই অন চায়না, প্রেসার অন বাংলাদেশ: আমেরিকাস লেটেস্ট গ্রেট গেম ইন দ্য ইস্ট' শিরোনামে এক নিবন্ধে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন চাপের অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে তুলে ধরেছেন সুবীর ভৌমিক। ছবি: সংগৃহীত

তিনি জানিয়েছেন, ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য খর্ব করার সাম্প্রতিকতম চেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতেছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন। 

সুবীর ভৌমিক বিবিসি ও রয়টার্সের সাবেক সংবাদদাতা। গত ৮ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল হেরাল্ডের অনলাইন সংস্করণে 'আই অন চায়না, প্রেসার অন বাংলাদেশ: আমেরিকাস লেটেস্ট গ্রেট গেম ইন দ্য ইস্ট' শিরোনামে এক নিবন্ধে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন চাপের অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে তুলে ধরেছেন তিনি।

ভৌমিক তার নিবন্ধে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে বাংলাদেশের ওপর তার কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে তা নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করেছেন।

নিবন্ধের শুরুতেই ভৌমিক কয়েকটি প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন এত মাথাব্যথা? বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কি পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের শেখ শাসিত দেশগুলোর চেয়ে খারাপ? যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশি পুলিশ অফিসারদের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে যারা রাজপথে ইসলামপন্থি উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে?

ভৌমিক বলেছেন, চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব কৌশল আঁটছে তার মধ্যেই এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের স্থল ও সমুদ্রে প্রবেশের রুটগুলোকে অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন।

চীনের এসব রুটের মধ্যে মালাক্কা প্রণালী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যাকে অনেক চীনা ভূ-কৌশলবিদ 'মালাক্কা চোকপয়েন্ট' বলে অভিহিত করে থাকেন। চারদিক থেকে আটকে ফেলার মার্কিন এই বজ্রমুষ্ঠি এড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে বেইজিং।

ভারতীয় এই সাংবাদিক তার নিবন্ধে বলেছেন, ভারত মহাসাগরে চীনের প্রধান দুই প্রস্থান রুট হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (ইউনান-রাখাইন) ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (জিনজিয়াং-বেলুচিস্তান)।

যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই উভয় রুটই ব্লক করতে চায়। এ কারণেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানে বেলুচ ও মিয়ানমারে রাখাইন বিদ্রোহকে সমর্থন করছে। গোপনে তাদের অস্ত্র, এমনকি ড্রোন সরবরাহ করছে

বাংলাদেশের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে ভৌমিক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার ও 'সুষ্ঠু নির্বাচনের' জন্য শেখ হাসিনা সরকারের ওপর অব্যাহতভাবে যে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করছে তার পেছনে তাদের বড় উদ্দেশ্য রয়েছে।

ওয়াশিংটনের এই চাপ মূলত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে দুটি সামরিক সম্পর্কিত চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে। চুক্তি দুটির একটির নাম ‘জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট যা সংক্ষেপে ‘জিসোমিয়া’ বলে পরিচিত। 

অপর চুক্তিটির নাম অ্যাকুইজিশনস অ্যান্ড ক্রস সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট যাকে সংক্ষেপে ‘এসিএসএ’ বলা হয়। এই দুই চুক্তির বাইরে এই অঞ্চলে তারা নোফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং তার জন্য লজিস্টিক সহায়তা আদায়ে নতুন করে আরও চাপ যোগ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি তা মেনে না নেন, সরকার উৎখাতে বিরোধীদের সহিংস আন্দোলনে সমর্থনসহ হস্তক্ষেপের বিভিন্ন হাতিয়ার তারা ব্যবহার করতে পারে। 

ভৌমিকের মতে, মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। তারই অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুর দিকে পরপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল আইলিন লোবাচার ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফর করেন।

কিন্তু শীত এলে যেমন বসন্ত পিছিয়ে থাকতে পারে না। তেমনি মার্কিন কর্মকর্তাদের দেখাদেখি শুরু হয় চীনা কর্মকর্তাদের আনাগোনা। ভৌমিক বলেন, মার্কিন রিয়ার অ্যাডমিরাল লোবাচারের সফর শেষ হতে না হতেই হাজির চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং (বর্তমানে অপসারিত)।

কিন গ্যাং আফ্রিকা যাওয়ার পথে কয়েক ঘণ্টার জন্য ঢাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.কে. আবদুল মোমেনের সঙ্গে বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টার একটি বৈঠক করেন। এরপর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের উপপ্রধান চেন ঝোউ-এর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে, লিখেছেন ভৌমিক।

নিবন্ধে তিনি বলেন, খুব সম্ভবত চীনারা আমেরিকার পরিকল্পনা আগেই আঁচ করতে পেরেছে এবং আগেভাগেই তা প্রতিরোধ করতে চাইছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশে খেলার জন্য কয়েকটি কার্ড তাদের হাতে আছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য তাদের বিশাল উন্নয়ন সহায়তা, যার অনেকগুলোই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

ঢাকা বিমানবন্দরে গভীর রাতের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সেই বিষয়টিই তুলে ধরেন বলে জানা গেছে। নির্বাচনের বছরে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে ত্বরান্বিত করার জন্য চীনের কাছ থেকে যা চায় তা পাওয়ার জন্য ঢাকা পরিস্থিতির সুবিধা নিতে পারে, লিখেছেন ভৌমিক।

তবে চীনারা শুধুমাত্র তখনই সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে, যখন তারা নিশ্চিত হবে যে ঢাকা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমর্থন করার প্রলোভন থেকে বিরত থাকবে। তাছাড়া এই নির্বাচনী বছরে শেখ হাসিনার কূটনৈতিক দক্ষতা অবশ্যই একটি বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। কারণ তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ চীন-মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে, লিখেছেন ভৌমিক।

ভৌমিকের মতে, মার্কিন কৌশল হলো রাখাইন রাজ্যের উপরে আকাশে মিয়ানমারের বিমান বাহিনীকে প্রভাব বিস্তার করতে না দেয়া। কেননা রাখাইনে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির যোদ্ধারা এখন দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু চূড়ান্ত ধাক্কাটা দিতে পারছে না। কারণ তারা বার্মিজ বিমান বাহিনীকে টেক্কা দিতে পারছে না।

সেক্ষেত্রে ওয়াশিংটন রাখাইন রাজ্যের ওপর বসনিয়ার মতো নোফ্লাই জোন তৈরির বিষয়টি ‘গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা’ করছে। নোফ্লাই জোন তৈরি করতে বঙ্গোপসাগরে বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলোর লজিস্টিক সহায়তার প্রয়োজন হবে, যা শেখ হাসিনার সরকারের ওপর মার্কিন চাপের অন্যতম কারণ।

ভৌমিকের মতে, মিয়ানমার নিয়ে চীনের উদ্বেগের কারণ, যদি রাখাইন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে স্বাধীনতা অর্জন করে, তাহলে এর ফলে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর ভেঙে পড়বে। এমনকি চীনের অর্থায়নে কিউকফিউ গভীর সমুদ্র বন্দরটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে পারে।

এছাড়া রাখাইন স্বাধীন হলে পশ্চিম মিয়ানমারের চিন ও কাচিন রাজ্যগুলোও উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। যেখানে রাখাইনের মতোই জাতিগত বিদ্রোহ চলছে। রাখাইন স্বাধীন হলে পালাক্রমে এই রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্ন ও স্বাধীন হওয়ার পথ সুগম হতে পারে

ভৌমিক বলেন, মিয়ানমার ভেঙে তিন বা চারটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কার ব্যাপারে ভারত হয়তো সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মধ্যদিয়ে চীনের দুটি করিডোর বিঘ্নিত হলে ভারত নিশ্চয়ই কিছু মনে করবে না। পাকিস্তান এরইমধ্যে বেলুচ বিদ্রোহীদের পক্ষে ভারত সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে। বেলুচরা সম্প্রতি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি চীনা নাগরিকদের ওপরও আক্রমণ করেছে।
সবশেষে সুবীর ভৌমিকের প্রশ্ন ছিলো এরকম যে, এ সবকিছু ভারত কীভাবে সামাল দেবে?

সর্বশেষ
জনপ্রিয়